জাল লাইসেন্সে অবৈধ অস্ত্রও হচ্ছে বৈধ

 

দেশে অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া বেশ কঠিন এবং জটিল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাল লাইসেন্স তৈরি করে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা জাল লাইসেন্স তৈরি করে সেই অস্ত্রের বৈধতাও দিয়ে দিচ্ছে।


খোঁজখবর নিয়ে জাল লাইসেন্সে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি চক্রের কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য মিলেছে। যেভাবে জাল টাকা, জাল স্ট্যাম্প তৈরি করা হয়; একইভাবেই আগ্নেয়াস্ত্রের জাল লাইসেন্স তৈরি করে এই চক্রের সদস্যরা। একটি আসল লাইসেন্স দেখে তা হুবহু অনুকরণ করে চক্রের এক্সপার্টরা। এরপর এসব ভুয়া লাইসেন্স ধরিয়ে দেওয়া হয় অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতাকে।


এই চক্রের মূলহোতা নড়াইলের কালিয়া থানার নবীর হোসেনের ছেলে পলাশ শেখ। এসএসসি পাশ এ যুবক ২০১৩ সালে ঢাকায় এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করেন। চাকরিরত অবস্থায় ২০১৫ সালে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তির পরামর্শে ভুয়া লাইসেন্সে একটি অবৈধ বন্দুক কেনেন পলাশ শেখ। লাইসেন্সসহ বন্দুক থাকায় বেশি বেতনে একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করেন তিনি। এরপর পলাশ শেখ নিজেই সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধপথে অস্ত্র এনে ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে বিক্রির কাজে নামেন। বিশ্বস্ত ৫-৬ জনকে নিয়ে দল গঠন করে কর্মকাণ্ড চালান।


পলাশ শেখ সম্প্রতি র‌্যাবের জালে ধরা পড়েছেন। চক্রের আরেকজন নওগাঁ সদরের শেরেকুল ইসলামের ছেলে মনোয়ার হোসেন। লেখাপড়া করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। ২০১৪ সালে চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আসেন মনোয়ার। শুরু করেন সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি। এক সময় পরিচয় হয় পলাশ শেখের সঙ্গে। প্রথমে পলাশ শেখের কাছ থেকে দুই লাখ টাকায় একটি একনলা বন্দুক কেনেন তিনি। এরপর একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে চাকরি নেন। পাশাপাশি দুজনে মিলে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র এনে ভুয়া লাইসেন্সে লোকজনের কাছে বিক্রি করতেন ২ থেকে ৩ লাখ টাকায়। তাদের আরও চার সহযোগী সম্প্রতি ধরা পড়ে র‌্যাবের জালে।


র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ বিষয়ে বলেন, অবৈধ অস্ত্র কিনে ভুয়া লাইসেন্সে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকজন। দেশব্যাপী এই জালিয়াতি ছড়িয়ে দেওয়া একটি চক্রের সদস্যদের আমরা আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি। তাদের পুরো চক্রকে ধরার জন্য আমাদের টিম কাজ করছে।


র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক মো. আনোয়ার হোসেন খান শুক্রবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আসে একটি চক্র অস্ত্র বিক্রি করছে। তারা সাত দিনের মধ্যে অস্ত্রের লাইসেন্স করে দেয়। এ প্রেক্ষিতে আমাদের একটি টিম কাজ শুরু করে। অবৈধ অস্ত্র ও জাল লাইসেন্সসহ ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথমে দুজনকে এবং পরে আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।


অভিযান পরিচালনায় যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, লাইসেন্সকৃত অস্ত্র থাকলে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি পাওয়া যায়। এ সুবাদে এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভুয়া লাইসেন্সে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করে। আবার কাউকে চাকরিও পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেয় তারা। তাদের কাছ থেকে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র ২টি ম্যাগাজিন, ১১৭ রাউন্ড গুলি এবং ১১টি জাল লাইসেন্স জব্দ করা হয়।


সূত্র জানিয়েছে, দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করা আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের বিষয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দেয়। এ বিষয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের বলেন, বেআইনি অস্ত্র খুব অ্যালার্মিং। অনেকে অস্ত্রের জাল লাইসেন্স বানিয়ে নিয়েছে। লাইসেন্সের সত্যতা যেন যাচাই করা হয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বড় আকারে যেন অভিযান চালানো হয়, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক থাকবে।


এর প্রেক্ষিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত ১৩ মার্চ থেকে সারা দেশে অভিযান শুরু হয়েছে। অনেকটা গোপনে চলছে অভিযান। যদিও এর আগের অভিযানগুলো হাঁকডাক দিয়েই শুরু করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বছরের ২০ নভেম্বর ঢাকার আদালত থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর সারা দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করে অভিযান পরিচালনা করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সেই রেড অ্যালার্ট পরে প্রত্যাহার হয়েছে নাকি বহাল রয়েছে তা আর পুলিশের পক্ষ থেকে খোলাসা করা হয়নি।


এরই মধ্যে ১৩ মার্চ থেকে যে অভিযানটি শুরু হলো তার কোনো তথ্যই গণমাধ্যম জানতে পারেনি। ১২ মার্চ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) মো. হায়দার আলী খান যুগান্তরকে বলেছিলেন, ২৬ মার্চকে সামনে রেখে সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করা হবে। কবে থেকে অভিযান শুরু হবে তা তিনি তখন নিশ্চিত করেননি। তবে সেই অভিযান যে ১৩ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে তা দুদিন আগেও পুলিশের কোনো সূত্র থেকেই নিশ্চিত করা হয়নি। শুক্রবার যুগান্তরের তরফ থেকে এ নিয়ে খোঁজখবর করা হলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অভিযান আগামী ২৭ মার্চ পর্যন্ত চলবে।


যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার কেএন রায় নিয়তি যুগান্তরকে বলেন, অভিযান চলমান রয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। তবে অভিযানের কোনো ফলাফল জানাতে পারেননি তিনি।


সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েই ঢোকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। পরে তা চলে যায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত এবং চিহ্নিত অপরাধীদের হাতে। এ কারণে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে গোপনে জোরালোভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে।


ডিএমপির পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০২২ সালে ডিএমপি অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংক্রান্ত মামলায় ৪১০ জনকে গ্রেফতার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৬২ রাউন্ড গুলি এবং ৪২৬৮ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য। র‌্যাবের পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে র‌্যাব ১ হাজার ৩৯৪টি বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫ হাজার ৯২১ রাউন্ড গোলাবারুদ জব্দ করেছে। অস্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ৬৩১ জনকে।


আর বিজিবির পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত বিজিবির অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ১২টি রাইফেল, ২৫২টি পিস্তল, ১৪টি রিভলবার, ৩৬৩টি অন্যান্যসহ সব ধরনে বন্দুক, ২২৮টি ম্যাগাজিন ও ১৬ হাজার ৯৬৭ রাউন্ড গুলি। সূত্র বলছে, নানা ফাঁকফোকরে নিরাপত্তা গলিয়ে দেশে চলে আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।


সংশ্লিষ্টরা জানায়, সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৩১২টি অস্ত্রের নিবন্ধন দেওয়া আছে। তবে মাত্র ৪৩ হাজার ৩১২টি অস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য রয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর, পুলিশের বিশেষ শাখা এসবি এবং সিআইডির কাছে। বাকিগুলোর কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।


একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈধ অস্ত্রের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ডাটাবেজ তৈরির কাজে উদ্যোগ নেয় ২০২১ সালে। সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজাদ রহমান শুক্রবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ব্যবহারকারীদের সব তথ্য এতে সংরক্ষণ থাকছে। ডাটাবেজের কাজ সম্পন্ন হলে কী ধরনের অস্ত্র কার কাছে আছে, তা প্রয়োজনে দেখা যাবে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال